হঠাৎ চুলের ব্যান্ড খুলে চুলগুলোকে হেলিকপ্টারের ডানার মত দ্রুতগতিতে একটা ঝাপটা দিল পাপড়ি, অতর্কিতে ব্যান্ডটা আমার চুলে বেধে দিয়ে সেদিকে বেশ ঋদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল- হুম, দারুণ মানিয়েছে ; ভাবছি, আমার সবগুলো ব্যান্ড, শ্যাম্পু, তেল তোমাকে দিয়ে দিলে কেমন হয়- দৈর্ঘ্যে তোমার চুলতো আমাকে প্রায় ধরেই ফেলেছে, সুতরাং বাড়তি যত্নটা চুলের প্রাপ্য- কী বল!
ওয়ান টাইম ইউজ কাপের চা’ টাকে লবণের জাহাজ মনে হল সহসাই, ওর কথা শুনে- কাপটা অর্ধপূর্ণ রেখেই ছুড়ে ফেলে কপট গাম্ভীর্যে বললাম- তোমার জিনিস আমি নেব কেন, আমার কি অর্থকড়ি কিছু নেই? তবে, ‘চুল বড় হয়েছে, কাটিয়ে ফেল’- এই সহজ কথাটা না বলে ইঙ্গিতপূর্ণ সুদীর্ঘ প্রবচনে প্রমাণ করলে -দিনে দিনে তুমি বাচাল হয়ে উঠছো, আরেকটু ভদ্রভাষায় বললে, কথার প্রতি স্নেহ যেন উপচে পড়ছে তোমার।
-না পড়ে উপায় কী? কিছুক্ষণ আগে বৃটিশ কাউন্সিলের অফিসে যে কীর্তিটা দেখালে তাতে তো ‘আমার নাম পাপড়ি’ এই কথাটাও কয়েক প্যারাতে বিভক্ত করে, উদাহরণসহ ব্যাখা দিয়ে, তারপর বলতে হবে- সে হাসতে হাসতে কথাটা বলে ফেলল বটে, তবে এই আশঙ্কাটাতেই এতক্ষণ শেভের অবহেলাহেতু গজানো ভ্রাম্যমাণ দাড়িতে অস্থিরভাবে হাত বুলাচ্ছিলাম, কথাটা সে দুম করে বলার পর ফানুসের মত চুপসে গেলাম নিমেষেই - বৃটিশ কাউন্সিলের সামনের আইল্যাণ্ডকে ‘মিস্ট্রিয়াস আইল্যান্ড’ ভ্রম হতে থাকল।
আজ বৃহস্পতিবার, তবে একাদশে বৃহস্পতির কোন লক্ষণ না পেয়ে উল্টো সকাল থেকেই ক্রমাগত শনির দশার প্রাদুর্ভাবে সংশয়ে আছি- আদৌ পঞ্জিকা সঠিক দিনক্ষণ নির্দেশ করছে কিনা ; ঘুম ভেঙ্গেছে মফঃস্বলের এক বন্ধুর ফোন পেয়ে- ওর বাবা গতকাল ঢাকা এসেছিলেন, সঙ্গের বাক্সপেটরা মিলে বেশ বড় একটা বহর তৈরি হয়েছিল, কিন্তু জিরো পয়েন্টে পৌছে বাস থেকে নামলে পুলিশ তাকে জেএমবি সন্দেহে আটক করে- সন্দেহের কারণ, তার শ্মশ্রুমন্ডিত মুখ এবং সঙ্গে ভারি ব্যাগ ; ক্ষুব্ধ বৃদ্ধ মানুষটি পুলিশের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেয়- দাড়ি থাকলেই জেএমবি_ এটা কেমন কথা! পুলিশের হাতে শ’দুয়েক টাকা ধরিয়ে দিলে হযত ছাড়া পেয়ে যেতেন, কিন্তু তর্ক করতে গিয়েই মামলায ফেসে গেছেন- কৌশলে তার ব্যাগে কিছু অস্ত্র ঢুকিয়ে পুলিশ তাকে সত্যিই জেএমবি হিসেবে গ্রেফতার দেখিযেছে। কান্নাজড়ানো কন্ঠে বন্ধুটি ফোন করে বলেছে আমি যেন এটা নিয়ে পত্রিকায় লিখি- তাতে তার বাবা ছাড়া পাবে, এমনটাই বিশ্বাস। কিন্তু আমি কযেকটি পত্রিকায় প্রদায়কের কাজ করি এটা যেমন সত্যি, তেমনি আমি কিছুই করতে পারবোনা এ ধারণাও অমূলক নয়- নিছক পুলিশ কেস হলে পত্রিকাগুলোতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যেত, কিন্তু ‘জেএমবি’ ইস্যু জড়িত থাকায় নির্ভার হতে পারছিনা- কেন জানিনা ‘জেএমবি’ শব্দটাতেই পত্রিকাগুলো মুনাফার মৌ মৌ গন্ধ পায়, তাই যত মানুষ জেএমবি সন্দেহে ধরা পড়ছে ফি-দিন, তাদের কারো প্রকৃত পরিচয় উদঘাটনেই কোন পত্রিকার আগ্রহ দেখিনি, উপরন্তু পাবলিক সেন্টিমেন্টকে পুজি করে কথার মশলা দিয়ে এমন খবর পরিবেশন করে যে, সেটা শেষতক খবর থেকে খাবার হয়ে উঠে। আমি যদি এটা নিয়ে লিখি, তাহলে সেটা তো ছাপবেইনা, বোনাস হিসেবে বাকিদিনগুলোতেও লেখা ছাপানো বন্ধ হয়ে যাবে এটা নিশ্চিত; তবুও ওকে বলেছি, অবশ্যই লিখবো- আমার ভোরটাই শুরু হয়েছে একটি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে।
ভারী বর্ষণের পর মেঠোপথ যেমন কর্দমাক্ত হয়, তেমনি এক বেদনার বর্ষণে কর্দমাক্ত হৃদয় নিয়ে বাজারে গেলাম ফোনটা ছেড়ে।
গতকাল গভীর রাতে কয়েকবন্ধু মিলে রাতের ঢাকা পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলাম- আলো জ্বলছে মশালের মত, খাবারের দোকানগুলো খোলা আছে যথারীতি, মাঝে মাঝে দু-একটি বড় যানবাহন উলুধ্বনির মত শব্দে চলে যাচ্ছে- তন্দ্রচ্ছন্ন ঢাকার যেন কোয়েকাফ নগরীতে রূপান্তর ঘটেছিল গুমোট রাত্রিতে, সেসময় মহিষের পাল পশুদের নিজস্ব কুচকাওয়াজের রেওয়াজ মেনে রাস্তা দখলে নিয়েছিল, ভোরের আগেই এই মহিষগুলো জবাই হয়ে ‘গরুর মাংস’ হিসেবে দেদারছে বিক্রি হবে- এটা ভেবে মহিষদের প্রতি করুণা অনুভব করছিলাম, কারণ পশু হক-মানুষ হোক, স্বকীয়তাটা জন্মগত অধিকার- মহিষ কেন সেই অধিকার বঞ্চিত হবে! বাজারে গিয়েও দোকানে দোকানে মহিষের মাংস খুঁজলাম, কোথাও না পেয়ে আগেকার করুণাটা আফসোসে পর্যবসিত হল।
মাংস ভুলে কোনরকমে ফরমালিন মেশানো সবজি আর বরফে ঠাসা ৩দিনের পুরনো রুই মাছ কিনে বাসায় ফিরে মেজাজটা তিরিক্ষিতে উন্নীত হল- ৭০ এর দশকের বিরহিনী শাবানার মত করে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাজের বুয়া- রান্না হয়নি এখনো, গ্যাস চলে গেছে সকাল বেলাই। নাস্তাটা বাইরে সারার মানসিক প্রস্ততি নিয়ে বাথরুমে গিয়ে অর্ধেক গোসল করার পর পানিও চলে গেল; ‘শালার চালকুমড়ার ঢাকার শহর’- অসচেতনভাবেই আমার মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে এসেছিল। পানি নেই, গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই- এত নেই নেই কাহাতক সহ্য হয়, অথচ এই একই শহরেই শপিং মল-বহুতল ভবনগুলোতে বিদ্যুৎ আর পানির বেহিসেবী-ব্যভিচারি প্রমোদলীলা চলে।
শনিচক্রের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত ঘটল বৃটিশ কাউন্সিলে টোফেলের ফর্ম জমা দিতে গিয়ে। এর আগে যতদিন বৃটিশ কাউন্সিলে গিয়েছি কর্মকর্তাদের যান্ত্রিক ব্যবহারে উপলব্ধি করেছি, এখানে চাকরি করার জন্যই বোধহয় এদের জন্ম হয়েছে, মাঝে মাঝে ভেবেছি মানুষ সরিয়ে গুটিকয়েক রোবট বসিয়ে দিলেও একইরকম সার্ভিস পাওয়া যেত। কিন্তু আজ আমাদের ফরম দুটো জমা দিতে গিয়েই জমা গ্রহণকারী টেকো মাথার অফিসারটিকে মুখটিপে হাসতে দেখলাম; সঙ্গে পাপড়ির মত একজন নারী আছে- হয়ত তাকে দেখেই টাকলু ব্যাটার জিহ্বা লকলক করছে, এমনটা অনুমান হওয়ামাত্র তার চরিত্রের কদর্যতায় শরীর ঘিনঘিন করছিল, কিন্তু একটু পর তিনি যা দেখালেন তাতে সিরাজউদ্দৌলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে অসহায় বোধ করতে থাকলাম- ঐ যে, বন্দী নবাবের জন্য কাটার সিংহাসন বানানো হয়েছে, আশপাশের বন্দীরা তাকে উপহাস করছে, খানিকবাদে মোহাম্মদী বেগ ‘সেই সুযোগ তুমি পাবেনা শয়তান’- বলে নবাবহত্যা সম্পণ্ন করল, সেই দৃশ্যটা। সংক্ষেপে শানে নযুলটা বলি: আমাদের ফরম পূরণে কোন ভুলভ্রান্তি হয়নি, কিন্তু ফরমের উপর সংযুক্ত ছবিটাই এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে- আমার ফরমে পাপড়ির ছবি, আর পাপড়িরটায় আমার ছবি লাগিয়েছি সকালের তাড়াহুড়োয়- এই ক্যালাস সম ভুলের কী-ই বা ব্যাখ্যা থাকতে পারে!
অনেক্ষণ আমাদের মধ্যে কোন আলাপচারিতা নেই- পাপড়ি আপনমনে আইসক্রিম খাচ্ছে, আমি আরেক কাপ চা ধরেছি ; অন্যসময় হলে সিগারেট চলত, কিন্তু এই মেয়েটা সিগারেট কে সপত্নী, নয়তো রাজাকার ভাবে বোধহয়- নইলে আমাদের অদূরে বসে ধূমপানরত ছেলেটির কাছে গিয়ে তাকে সিগারেটটা শেষ করতে অন্যকোথাও যেতে অনুরোধ করবে কেন সে। তার এইসব আচরণকে অদ্ভুত, নাকি উদ্ভট বলব, সেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোনদিনই বোধকরি আসা হবেনা আমার।
‘আলভি দেখো দেখো, ওই যে ঐ রিক্সায় বসা লোকটা’- কথাটা বলে যেভাবে আমার হাতধরে হ্যাচকা টান দিল সে, তাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার কোলেই ঢলে পড়েছিলাম আর একটু হলে; কিঞ্চিৎ রাগতস্বরে বললাম- কী ব্যাপার বলতো, টান দেয়ার ধরনে তো মনে হল, আমি অগ্নিদগ্ধ বসুন্ধরা সিটির ২১তলায় আটকা পড়েছি, তুমি উদ্ধারকারী দমকল সদস্য। কই, কোন্ রিক্সা, কোন্ লোকটা?
সে কিছুটা আহত হল, বৃটিশ কাউন্সিলের প্রান্তসীমার একটি রিক্সার পিছন দিকটাতে তর্জনী নির্দেশ করে বলল- আরে, ঐ রিক্সাটা; এত দেরি করলে চলন্ত রিক্সা তোমার জন্য থেমে থাকবে নাকি?ঐ রিক্সাটার আরোহীর শার্টে মাঝের ২টি বোতাম নেই, দেখে বেশ হাসি পাচ্ছিল।
ক্রোধ কখনো কখনো কৌতুককর হয়ে উঠে, আমার বেলায়ও তা-ই ঘটল- একজন লোক রিক্সায় করে যাচ্ছে, তুমি এখানে বসেই খেয়াল করলে তার শার্টের ২টা বোতাম নেই? এটা কেমন ভদ্রতা!
-সবাইকে নিজের মত তালকানা ভাবো কেন? আমি আজ কোন রঙের পোষাক পরেছি সেটাই তো তোমার নজরে আসেনি, তাই ব্যাপারটাকে তোমার কাছে অকিঞ্চিৎকর ঠেকছে, কিন্তু রাস্তাঘেষা আইল্যান্ডে বসে থেকে এরকম দু-একজন রিক্সা আরোহীর দিকে দৃষ্টি যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। সে একটু দম নেয়া বিরতি নিল, এরপর গলার স্বরে উৎসাহের আভাস পেলাম- আমার কী মনে হয় জানো?-লোকটা বিপত্নীক, ৩-৪বছরের ছোট্ট একটা বাচ্চা আছে। বিপত্নীক বললাম, কারণ স্ত্রী থাকলে এই ব্যাপারটা অবশ্যই খেয়াল করতেন তিনি, এছাড়া লোকটার চেহারাটাও উশকোখুশকো লাগল- ধরো, জীবনের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা না থাকলে যেরকমটা হয়, অনেকটা অনিচ্ছায়-জোর করে বাঁচার মত; সেজন্যই বাচ্চাটাকে আনলাম তার বেঁচে থাকার একমাত্র পিছুটান হিসেবে।
ওর এই তাৎক্ষণিক এনালজি তে কৌতূহল জাগল মনে- তুমি যে যুক্তিতে লোকটাকে বিপত্নীক বলছো, একই যুক্তিতে তাকে অনায়াসেই একজন ছন্নছাড়া গোছের ব্যাচেলর ভাবতে পারি- এ ধরনের মানুষরা সাধারণত অগোছালো-বাস্তবজ্ঞানশূন্য হয়ে থাকে; প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্তের একজন তো এ মুহূর্তে তোমার পাশেই বসে আছে।
শেষ কথাটাই তাকে কনভিন্স করতে যথেষ্ট হল- হ্যা তাইতো; তাহলে লোকটা কোন স্যাতসেতে ঘুপচির গণমেসে থাকে, তার রুমটা ঘরের শেষপ্রান্তে, বছরের অধিকাংশ সময়ই রুমের লাইট নষ্ট থাকে, বালিশে তেলাপোকা, মশারিতে ছারপোকা, খাটের নিচে সপরিবারে ইদুরের বসবাস, আর মাথায় স্বাধীন-সার্বভৌম উকুনরাজ্য।
এইবার সত্যিই না হেসে পারলাম না- ধুর, কী সব আজগুবি গবেষণা শুরু করলে; প্রতিমিনিটে কত মানুষ রিক্সায় চড়ে কতজায়গায় যাচ্ছে- সবার সম্পর্কে এভাবে প্রেডিক্ট করতে থাকবে নাকি?রোদেরা জঙ্গি হয়ে উঠেছে, এখানে বসে না থেকে চল শাহবাগ লাইব্রেরীতে যাই।
বৃটিশ কাউন্সিল থেকে শাহবাগ লাইব্রেরীর দুরত্ব খুব বেশি না হলেও রৌদ্রের মধ্যে রিক্সাই ভরসা, যদিও আমাদের রিক্সায় হুড তোলাটা নাস্তিকের হজ্জ্ব পালনের মত অসম্ভব ঘটনা- দুজন তরুণ-তরুণীর রিক্সায় হুড তোলা দেখলে আশেপাশের মানুষের রসালো ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিটাকে যেকোন বিকৃত পর্ণো চলচ্চিত্রের চেয়েও অশ্লীল লাগে, তাই গরমে বড়ইভর্তা হলেও হুডের প্রশ্নে আমরা অনড়।
লাইব্রেরীতে আমাদের আজকের বইপড়ার ধরনটা বেশ উপভোগ্য- বই পড়বো শেষ পৃষ্ঠা থেকে, অর্থাৎ সর্বশেষ পৃষ্ঠাটি সর্বপ্রথমে পড়ে, এর আগের পৃষ্ঠাতে নজর দেব, এরপর তার আগেরটা, এভাবে প্রথম পৃষ্ঠাটা পড়া হবে একেবারে শেষে।এ ধরনের পরীক্ষায় আগে পড়া কোন বই কার্যকরী হতে পারে, সেই ভাবনায় শুরুতে আমি নিয়েছিলাম মির্চা এলিয়াদের ‘লা নুই বেঙ্গলি’, আর মৈত্রেয়ী দেবী তাঁর জবাবে যে ‘ন্যহনতে’ লিখেছিলেন, সেটা নিয়েছিল পাপড়ি।বই দুটি এমনিতেই তুমুল জনপ্রিয়, তদুপরি এর অনুকরণে বলিউডে ‘হাম দিল কে চুকে সনম’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়ে জনপ্রিয়তাটা ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। তবে, আমাদের এই উল্টোরথ যাত্রায় বই দুটো বেশিক্ষণ সারথি হতে পারেনি- সংলাপ, কাহিনীবিন্যাসসহ সবকিছুই বহুলপঠিততায় প্রায় ঠোটস্থ, বিপরীত দিক থেকে পড়লেই কি তা বদলে যাবে? অবধারিতভাবেই তাই বই বদলে গেল- তাদের স্থলে এল আলবেয়ার ক্যামুর ‘লড়াই’ এবং পাওলো কোয়েলহোর ‘সুবর্ণস্রষ্টা’। কোয়েলহোর বইটার শেষপৃষ্ঠার শুরুর লাইনগুলি এরকম- ‘মোহর নয়, সিন্দুকের মধ্যে ছিল অমূল্য সব রত্ন, লাল ও সাদা রঙের পালক লাগানো সোনার মুখোশ, মণিমাণিক্যখচিত বহুমূল্য পাথরের কিছু মূর্তি। মনে হয়, কোনো বিজেতা এগুলি এখানে রেখেছিল, পরে উত্তর-পুরুষকে কোন কারণে দিয়ে যেতে পারেনি’।– মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ে যাচ্ছি, আর অপেক্ষা করছি আগের পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে জানবার, তবে বাংলাদেশী অনুবাদসাহিত্য যথারীতি এভারেস্ট উচ্চতার হতাশা উপহার দিল, বিশেষত বাক্যগুলো পড়ে নিজের মত তর্জমা করে নিতে হচ্ছে বিধায় সুখপাঠ্যতা শব্দটির সঙ্গে অনতিক্রম্য দুরত্বটা রয়েই গেল। অন্যদিকে, পাপড়ির প্রতিক্রিয়াটা বুঝতে পারছিনা- সে কেবল উল্টো দিক থেকে পৃষ্ঠা উল্টে যাচ্ছে, এত অল্পসময়ে একপৃষ্ঠা পড়াটা একটু বেশিরকমই অসম্ভব, সে কি এই অভিনব পড়ার ধরনটা ধরতে পারছেনা?
লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আইল্যান্ড ধরে টিএসসির দিকে চললাম। এই আইল্যান্ডগুলো সস্তাদরে বই কেনার ক্ষুদ্র আড়ত বলতে গেলে। যদিও এখানে ওপার বাংলার সমরেশ-সুনীল-শীর্ষেন্দু, আর তসলিমা নাসরিনের বইয়েই সয়লাব থাকে অন্যান্যদিন, আজ তিলোত্তমা মজুমদারের বইয়েরও চালান দেখছি- গত বইমেলায় কেনা এই লেখিকার ‘এসো, সেপ্টেম্বর’ পড়ার পর, তার বইগুলোকে কাগজের ঠোঙ্গা তৈরির কাচামাল মনে হল অযাচিতভাবেই; বই দেখা ছেড়ে রাস্তার জ্যামিতি বুঝতে বুঝতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি পাশাপাশি দুজন মানব-মানবী, প্রতি পদক্ষেপে আমাদের শরীরের ছায়াগুলো পরস্পরের সঙ্গে টক্কর খেয়ে নতুন দৈর্ঘ্যের ছায়া তৈরি করে চলেছে।
জানো আলভি, সেই লোকটা সম্পর্কে নতুন একটা ধারণা হচ্ছে এখন- এতটা নাতিদীর্ঘ পথ হেটে এসে টিএসসির বারান্দায় বসে শুরুতেই পাপড়ির মুখে সেই পুরনো অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গের কথা শুনতে মোটেই আগ্রহ ছিলনা, তবুও কৃত্রিম একটা কৌতূহলসূচক কন্ঠে বললাম- তাই?বলো, শুনি
-লোকটা আসলে কোন সরকারি অফিসের কেরানি হবেন- হাতের ব্যাগ, চুলের সিথি দেখে মনে হল।ঢাকাতে কষ্টেশিষ্টে মেসে থাকেন, কিন্তু গ্রামে তার বিশাল পরিবার, ৬মাসে একবার হযত গ্রামে যান, বৃদ্ধ বাবা-মা, অনুঢ়া বোন, ছোটছোট ছেলেমেয়ের খরচ- এতগুলো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের দায়িত্বটাই প্রকৃতির উপর ন্যস্ত করে দিয়েছেন।
-এই ধরনের অযৌক্তিক ধারণাগুলো কিভাবে কর, বলবে?-লোকটা রিক্সায় গেছে সাড়ে এগারোটার দিকে, তো ঐ সমযে কেরানী সাহেব কি বৃটিশ কাউন্সিলে আইএলটিএস এর ক্লাস করতে এসেছিলেন?-রসিকতা দিয়ে শুরু করলেও নিজস্ব ধারণাটাও শেয়ার করলাম কথাচ্ছলে- সম্ভবত তিনি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন, ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে শার্টের বোতাম ছিড়ে গেছে।
- মন্দ বলনি, তবে ছিনতাই সংক্রান্ত দুর্ঘটনা হলে শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকত ; আচ্ছা, এমন কি হতে পারে- লোকটা কোন বিখ্যাত শিল্পপতি, অতিরিক্ত সাদাসিধা সাজার প্রচেষ্টায় ছিন্নবস্ত্র আর রিক্সাকে বাহন করেছেন। হতেই পারে কিন্তু- ধনীদের এরকম অসংখ্য শৌখিন বিলাসের গল্প পড়েছি; তবে লোকটার বয়সটা একটা বাধা এক্ষেত্রে- একঝলক যা দেখেছি, তাতে তো ৩০ এর আশেপাশেই মনে হল, অবশ্য ক্ষণিকের দেখা ভুলও হতে পারে।
আমি উশখুশ করতে লাগলাম- আবার গবেষণা শুরু করলে!আজ কি কথা বলার বিষয়ের সংকট চলছে?
সে মনোঃক্ষুণ্ন হল- বেশ, গবেষণায় ইস্তফা দিলাম, অন্যকথাই বলি নাহয়; কাল সিমির পিসিতে ভীষণ টাচি একটা কলকাতা বাংলার সিনেমা দেখলাম- একজন বারবণিতার জীবনালেখ্য বলতে পার।
আমি বেশ নির্বিকারভাবে বললাম- সিনেমার নায়ক নিশ্চয়ই মহা গোবর্ধন, পিপড়া দেখলেও মায়ের আঁচলে লুকায়?এরপর বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে যায়, এত বাহারি সাজের নারী দেখে ভড়কে যায় সে, সেটা দেখে সেখানকার নারীগুলো সোল্লাসে কোরাস গেয়ে উঠে, সে একজনের ঘরে ঠাই নেয়, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে ঐ পল্লীতে যায় সবাই, সেসব কিছুই না করে সে মেয়েটির জীবনের গল্প শুনে, এরপর প্রায় প্রতিদিনই মেয়েটির কাছে যাওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়, একসময় পরিবার ও সমাজকে উপেক্ষা করে মেয়েটিকে সে বিয়ে করে, এরকম কাহিনী তো?
পাপড়ির চোখ কপাল ডিঙ্গিয়ে তালগাছে উঠলো যেন- আরে, তুমি দেখেছো নাকি? সিনেমার ৯০শতাংশ ঘটনাই তো মিলে গেল!
-এই থিমের গল্প-উপন্যাস-সিনেমাগুলো ঘুরেফিরে এই কাঠামোর কাহিনীতেই আটকে থাকে। তবে ব্যক্তিগতভাবে এই কাহিনীগুলোকে আরোপিত ও অনেক বেশি থিওরিটিকাল লাগে আমার- শিল্প-সাহিত্যে ‘পতিতা’ শব্দটার বেশ শক্তিশালী অবস্থান আছে একটা, যেকারণে সিংহভাগ লেখকেরই এই থিমে ন্যুনতম একটা লেখা আছেই, যদিও সেই একই বলয় ভাঙতে পেরেছেন হাতে গোনা দু-একজন।
- এই থিমে সমস্যা কী? পতিতাদের ঘৃণা করো নাকি?- তার মধ্যে উত্তেজনা ভর করল।
- ঘৃণা-ভালবাসার প্রশ্ন নয়, ব্যাপারটা হচ্ছে গ্রহণযোগ্যতার। একজন পতিতাকে আমি হেয় করলাম না, কিন্তু তাই বলে তাকে বিয়েই কেন করতে হবে?মানছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকে, তবুও আমার স্ত্রী একসময় হাজারো পুরুষের সম্ভোগে ব্যবহৃত হয়েছে, এটা মেনে নিতে মনের কোথাও একটা বাধা বা দ্বিধা কাজ করে।
- এই বাধাটাকে বলে সংস্কারচ্ছন্নতা। তুমি একজন লেখক- যাবতীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে তোমার পক্ষে সৃজনশীল হওয়া কোনভাবেই সম্ভব হবেনা।
-দয়া করে এই কথাটা ২য় বার বলোনা; তুমি কি মনে করো কবি-সাহিত্যিকরা সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ, কিংবা তারা যত নীতিকথা লিখেন, তার কানাকড়িও ব্যক্তিজীবনে পালন করেন? কবি বললেই সাধরণ দৃষ্টিতে ভেসে উঠে, একজন এলেমেলো দীর্ঘ চুলের ভাবুক, যিনি দিন-রাত মদ-গাজা-আফিম-ভাং এ চুর হয়ে থাকবেন, এমন? এগুলো সবই ভড়ংবাজি- নিজেদের অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণ ঢাকতে নেশাকে সৃজনশীলতার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার একটা অপচেষ্টা, এর মধ্যে কোন সংকীর্ণতামুক্তি নেই। আমি আমার গল্পে এমন কিছু কখনই লিখবোনা যেটা নিজে অবিশ্বাস করি।
-তুমি তো আলোচনাকে কবিদের ব্যক্তিগত জীবনে টেনে নিয়ে ব্যক্তিমানুষ ও কবিসত্তাকে মিশিয়ে ফেললে। যা-ই হোক, এটা নিয়ে তর্ক করতে ইচ্ছা করছেনা এখন। চল, উঠা যাক।
দীর্ঘক্ষণ ধরে নতুন একটা গল্প লেখার চেষ্টা করছিলাম; আমরা বিচ্ছিন্ন হবার কয়েকঘন্টার ব্যবধানে মাথাটা আইডিয়াশূন্য হয়ে পড়েছিল আচমকা - যা লিখি, কোনটাই মনোঃপুত হচ্ছিলনা বলে বাধ্য হয়ে বহুপ্রচলিত কাহিনীকে বাড়তি অলংকারে ভারি করে একটা হালকা রম্য গল্প দাঁড় করেছিলাম- অর্ধেক পৃষ্ঠা লেখার পর্যায়ে পাপড়ির ফোনে মনোযোগ বিঘ্নিত হল- হ্যালো আলভি, রাতে হলের ছাদে হাটার সময় সেই লোকটার কথা আবারো মনে পড়ল। এখন ভয়ানক সব ধারণা আসছে মাথায়- লোকটা নির্ঘাৎ একটা খুন করেছে আজকে, তাই পোশাক লক্ষ্য না করেই হন্তদন্ত হয়ে শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল। তুমি কী বল?
একবার লেখায় বিঘ্ন ঘটলে পুনরায় মনোযোগ দিতে বেশ সময় লাগে আমার, তার এই অনাহুত কর্মকাণ্ডে স্পষ্টতই বিরক্ত হলাম, তবুও কোমল কণ্ঠে ‘আজ একটু তাড়াতাড়িই ঘুমাও পাপড়ি, সকালে কথা হবে’-এই একটিমাত্র বাক্য উচ্চারণ করে ফোনটা রেখে দিলাম।
বারান্দায় দীর্ঘক্ষণ অস্থির পায়চারি করে লিখতে বসেছি আবার, লেখাটার শিরোনাম দিয়েছি ‘মোনালিসার মধ্যবিলাস’; নতুনভাবে লেখা শুরুর প্রাক্কালে সেই অর্ধেক লেখাটুকু আদ্যন্ত পড়তে থাকলাম:
প্রতিটি আধুনিক পুরুষের শৈশব শুরু হয় একটি রহস্যাবৃত রমণীমুখ দর্শনে, কৈশোর-যৌবন কেটে যায় সেই বলয়ের আবর্তেই। অতঃপর বার্ধক্যে গিয়ে খেয়াল হয় তার পুত্র-পৌত্ররাও সেই একই রহস্যানুসন্ধানে ব্যস্ত। অথচ প্রকৃত সত্য সকলেরই অধরা । বহু শতাব্দী যাবৎ তাবৎ পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণী-শিল্পরসিকদের মোহাবিষ্ট করে রাখা এই নারী শিল্পী লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চির কল্পিত চরিত্র ’মোনালিসা’। মানবীয় মুখের অন্তরালে একটিমাত্র নারীই হয়ে উঠেছে চিন্তা-দর্শন-বিজ্ঞান- সবকিছু। মোনালিসার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে আজও অমীমাংসিত বিতর্কের ঝড় উঠে বিজ্ঞ মহলে ; এমনকি ইণ্টারনেটে সাড়ে তিনঘন্টা চ্যাট করা তরুনটিও সহসাই প্রশ্ন করে বসে “who, the hell, is this Monalisa? ” অবশেষে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন দ্য ভিঞ্চি স্বয়ং। নরকের ব্যস্ততম দিনগুলোর কোন এক অবসরে চিত্রকর রাফায়েলকে তিনি একটি sms পাঠান ; কিন্তু এটা ছিল নরকের নিয়ম পরিপন্থী- কারণ এতে তথ্য পাচারের ঝুঁকি থাকে। দুর্ভাগ্যক্রমে দ্য ভিঞ্চির sms টি নরকের সবচেয়ে বদরাগী দেবদূত পড়ে ফেলেন - নিয়ম ভঙ্গের অপরাধে ভিঞ্চিকে ১০০টি বেত্রাঘাত করা হয, আর তার মোবাইলটি জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়। এরপর...?
সকালবেলা ঘরের সামনে একটি অপরিচিত মডেলের মোবাইল পড়ে থাকতে দেখে দেখে চারপাশে একবার সতর্ক কুকুরের দৃষ্টিতে তাকিয়েই সেটি পকেটে পুরলাম।ঘরে এসে মোবাইল ঘেটে একটি sms পেলাম শুধু। পুরোটা পড়ে এখন পৃথিবী নয়, আমিই ঘুরছি লাটিম অথবা চরকির মত- হ্যা, মোনালিসা সম্পর্কে মুখ খুলেছেন দ্য ভিঞ্চি!
...............................................................................................................
............................................................................................................
(বৃদ্ধাঙ্গলে সুইয়ের তীক্ষ্ খোচা লাগল রেহানার, রক্তের উপস্তিতি দেখে তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল গার্মেন্টস কোম্পানীর উপর- কিভাবে যে শার্ট বানায় এরা, এত আলগাভাবে বোতাম লাগায় কেউ?২দিন হল নতুন শার্ট কিনেছে ছেলেটা, এরই মধ্যে ২টা বোতাম খসে পড়েছে। ছেলেটাও হয়েছে উড়নচন্ডী স্বভাবের- বড়বোনের সঙ্গে বাজি ধরে এই বোতামহীন শার্ট পরেই সারাটা দিন এখান-সেখানে ঘুরে আসল!মধ্যিখানে, শার্টে বোতাম লাগাতে গিয়ে তাকে সুইয়ের খোচা সহ্য করতে হল!)
(সমাপ্ত)
এই সিরিজের আগের গল্পগুলো:
৭দশ১’একাত্তর
সম্পূরক কোণ
লিখি চলো
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


